লেনদেন ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ

রাষ্ট্রীয়ভাবে গম কেনার পরও যুক্তরাষ্ট্র থেকে কমেছে বাংলাদেশের আমদানি

গত বছর ২৫ অক্টোবর দুপুরে পানামার পতাকাবাহী জাহাজ ‘এমভি নর্স স্ট্রাইড’ চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে যুক্তরাষ্ট্রের গমের চালান নিয়ে আসে। এ চালানে ছিল ৫৬ হাজার ৯৫৯ টন গম।

এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি করে বাংলাদেশ। এভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে জিটুজি (সরকার টু সরকার) ভিত্তিতে শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি কার্যক্রম।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, তাদের সঙ্গে একাধিক চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখন পর্যন্ত ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৮৮৪ টন গম আমদানি হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সূত্রগুলো বলছে, যুক্তরাষ্ট্রকে দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গমের পাশাপাশি সয়াবিনও আমদানি হয়েছে। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়ানোর জোর তৎপরতা ছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরোর পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের পণ্য আমদানি (বা বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি) ব্যয় কমেছে ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে আমদানির অর্থমূল্য ছিল ৭৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে আমদানি হয়েছে ৬৭ কোটি ৫৭ লাখ ডলারের।

ব্যাংকার ও সরকারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাণিজ্য চুক্তির দরকষাকষির অংশ হিসেবে ২০২৫ সালেই ব্যাপকভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি শুরু করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ও বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। ফলে দেশটি থেকে আমদানি কমার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যানে আমদানি চিত্র নেতিবাচক কেন তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার গম আমদানির অর্থ চুক্তি অনুযায়ী পরিশোধ করেছে সিঙ্গাপুরে। আবার বেসরকারি খাত যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানি করলেও তার বিপরীতে অর্থ পরিশোধ হয়েছে সিঙ্গাপুরে। এ কারণে পরিসংখ্যানগতভাবে আমদানির অর্থমূল্যে ব্যয়ের প্রতিফলন আসতে দেরি হয়ে থাকতে পারে।

শাহ্‌জালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করলে পণ্য আমদানির বিপরীতে অর্থ যে দেশেই পরিশোধ হোক না কেন, তার প্রতিফলন পণ্যের উৎস দেশের সঙ্গে বাণিজ্য পরিসংখ্যানে দেখা যাওয়ার কথা। কারণ দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে পণ্য রফতানি জার্মানিতে হলেও অর্থ পরিশোধ হয়েছে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে। কিন্তু তাতেও জার্মানির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য পরিসংখ্যানে রফতানির বিপরীতে প্রাপ্ত অর্থের প্রতিফলন দেখা যায়। অর্থাৎ অর্থ তৃতীয় কোনো দেশ থেকে এলেও পণ্য জার্মানিতে পাঠানো হলে রফতানি পরিসংখ্যানে তা প্রতিফলিত হয়। এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে অর্থ যে দেশেই পরিশোধ হোক না কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানির পরিসংখ্যানে সেই প্রতিফলন দৃশ্যমান হওয়ার কথা। কিন্তু পরিসংখ্যানে কেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি কমল তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন রয়েছে।’

বাণিজ্যে ঘাটতি কমিয়ে আনতে অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি করার জন্য দরকষাকষি শুরু হয় গত বছর এপ্রিলের পর থেকে। অন্তর্বর্তী সরকারের পাশাপাশি ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তারা গম, সয়াবিনের মতো কৃষিপণ্য আমদানি শুরু করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির জন্য সমঝোতা চুক্তি ও অঙ্গীকারবদ্ধ হয় মেঘনা গ্রুপ ও ডেল্টা অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্যক্তিখাতের উদ্যোক্তারা গত বছরই যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম ও সয়াবিনের মতো কৃষিপণ্য আমদানি করতে শুরু করেছেন। এরই মধ্যে আমদানি করা পণ্যের চালান বাংলাদেশে এসেছে। আমদানি পাইপলাইনে রয়েছে আরো পণ্য। ফলে পরিসংখ্যানে এ আমদানির প্রতিফলন না আসার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করছেন এমন আমদানিকারকরা। তবে অনেকে বলছেন, পণ্য আমদানির বিপরীতে অর্থ লেনদেনের যে প্রকৃত প্রবাহ হয় বাস্তবে নানা কারণে তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত বিষয়ের পাশাপাশি অর্থ পরিশোধ যেহেতু সিঙ্গাপুরে করা হয়েছে, তাই হিসাবায়নের পদ্ধতিগত কোনো কারণে এমনটা হতে পারে।

সীকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ডেল্টা অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, নানা কারণে পণ্য আমদানির প্রকৃত প্রতিফলন পরিসংখ্যানে আসতে দেরি হতে পারে। এক্ষেত্রে সফটওয়্যারে দেরিতে হালনাগাদ হওয়ার বিষয় থাকতে পারে। আবার সরকার যেমন পণ্য আমদানির অর্থ সিঙ্গাপুরে পরিশোধ করেছে, তেমনি আমার প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা পণ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলেও তার বিপরীতে অর্থ পরিশোধ হয়েছে সিঙ্গাপুরে। ফলে পদ্ধতিগত কারণে হিসাবায়নে বিলম্ব হয়ে থাকতে পারে। সরকারের গম আমদানির প্রতিফলনও পরিসংখ্যানে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান হয়নি।

গম আমদানির জন্য গত বছর ২০ জুলাই ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী, গমের চালান যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলেও অর্থ পরিশোধ হয় সিঙ্গাপুরভিত্তিক গম সরবরাহের তৃতীয় পক্ষ প্রতিষ্ঠান এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনালের সিঙ্গাপুরের ব্যাংক হিসাবে।

গত ২০ জুলাই গম আমদানির চুক্তির পর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টিমান ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও আমেরিকার মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। আগামী পাঁচ বছর প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে সাত লাখ টন উচ্চমানের গম আমদানির বিষয়ে সমঝোতা স্মারকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর এবং আমেরিকার পক্ষে ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের ভাইস প্রেসিডেন্ট জোসেফ কে. সোয়ার স্বাক্ষর করেন।

চুক্তি অনুযায়ী, গমের ক্রেতা খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য অধিদপ্তর। বিক্রেতা সিঙ্গাপুরে অবস্থিত এগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেড। চুক্তি হয়েছে এ দুই পক্ষের মধ্যে। বিক্রেতাকে মনোনীত করেছে ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটস। চুক্তি অনুযায়ী বিক্রেতা ক্রেতার কাছে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত ২০২৫ বা সর্বশেষ মৌসুমের ২ লাখ ২০ হাজার টন করে মিলিং গম বিক্রি করবে।

চুক্তিতে থাকা পরিশোধের শর্ত অনুযায়ী, ক্রেতা একটি অপরিবর্তনযোগ্য এলসি বা ঋণপত্র খুলবে, যার ভিত্তিতে শিপিং নথি গ্রহণের পর ৯৫ শতাংশ মূল্য পরিশোধ করা হবে। বাকি ৫ শতাংশ অর্থ গুণগত মান ও চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পরিশোধ হবে।

ঋণপত্র অনুযায়ী গম পাঠানো হবে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বন্দরের মাধ্যমে। গম গ্রহণ করা হবে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে। মোট চালানের ৬০ শতাংশ আসবে চট্টগ্রামে ও ৪০ শতাংশ পৌঁছবে মোংলায়। ঋণপত্রে পণ্যের উৎস দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখ রয়েছে।

দীর্ঘ নয় মাসেরও বেশি সময় ধরে দরকষাকষির পর চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি এ চুক্তির আওতায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত পাল্টা শুল্ক নিয়ে দেশটিতে শুরু হয়েছে আইনি জটিলতা। যদিও এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে গম, ভুট্টা, সয়াবিন, তুলাসহ বেশকিছু পণ্য আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এলএনজি, উড়োজাহাজ, যন্ত্রাংশসহ আরো নানা পণ্য আমদানির বিষয়ে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। সরকারের গম আমদানির চালান দেশে আসার পাশাপাশি ব্যক্তিখাতের প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা পণ্যের অংশবিশেষও দেশে এসেছে।

গত বছর জুলাইয়ের শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিনবীজ আমদানির তাৎক্ষণিক সমঝোতা হয়। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল সয়াবিনবীজ আমদানির সমঝোতা করেন। মেঘনা গ্রুপ ছাড়াও ডেল্টা অ্যাগ্রো ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ সয়াবিনবীজ আমদানির সমঝোতা করেছিল। যার আওতায় এরই মধ্যে পণ্যটির কিছু চালান দেশে এসেছে।

বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি সূত্রগুলো পণ্য আমদানি বৃদ্ধির কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বিদায়ী বছরের শেষ প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের আমদানি বাড়েনি বরং কমেছে। একইভাবে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানিও (বা বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি) কমেছে। যদিও রেসিপ্রোকাল ট্রেড বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে পণ্য রফতানি বৃদ্ধির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। সেনসাস ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৭১৪ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৬০৬ কোটি ৩৫ লাখ ডলার।

সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষপঞ্জি পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় রাতারাতি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমার প্রবণতা দৃশ্যমান হবে না। এমনকি অর্থবছর হিসাব করলেও এখনই ঘাটতি কমার বিষয়টি পরিসংখ্যানগতভাবে প্রতিফলিত হবে পর্যায়ক্রমে।

জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, বর্ষপঞ্জি ও অর্থবছরের পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র আসার কথা। গত বছর যে সময়ে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আমদানি শুরু হয়েছিল, সে সময় বিবেচনায় আমদানি বেড়েছে। যেমন সয়াবিন আমদানি অনেক বেড়েছে। আবার সরকারের এলএনজি আমদানি রয়েছে বার্ষিক ৬০ কোটি ডলারের, এটা ফিক্সড। গম আমদানি বেড়েছে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের আমদানি অর্থমূল্য এরই মধ্যে ৭২ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। আবার আমদানীকৃত গম পাইপলাইনেও আছে। কাজেই অর্থবছর হিসাবে ঘাটতি অনেকটা কমবে।

সরকারি ও বেসরকারি খাতে এ আমদানি বৃদ্ধির প্রতিফলন অর্থবছর হিসাবেও পড়েনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস জুলাই থেকে ডিসেম্বরের আমদানি পরিসংখ্যানের সঙ্গে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমেনি বরং বেড়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৩২৩ কোটি ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে ঘাটতি বেড়ে হয়েছে ৩৩৪ কোটি ৪১ লাখ ডলার।

আরও